পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ‘মহানায়ক’ বললেই প্রথম যে নামটি উচ্চারিত হয়, তিনি উত্তমকুমার। নায়ক ও সুপারস্টার অনেকেই এসেছেন, কিন্তু এই বিশেষ উপাধি যেন আজও একান্তই তাঁর। কারণ, তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়েছিল বাঙালির জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগে। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও তাঁর সিনেমা নতুন দর্শক খুঁজে পায়, অভিনয় নিয়ে গবেষণা হয়, আর মৃত্যুবার্ষিকী এলেই দুই বাংলায় ফিরে আসে তাঁকে ঘিরে অগণিত স্মৃতি।

২৪ জুলাই ছিল মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান ভক্ত, শিল্পী ও সংস্কৃতিজনেরা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করে স্মরণসভা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিনভর চলে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু উত্তমকুমারের আবেদন আজও অমলিন।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর জন্মনাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে কলেজজীবন শেষ করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে পোর্ট কমিশনার্স অফিসে কেরানির চাকরি নিলেও অভিনয়ের স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটার ও যাত্রার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। স্কুলের নাটক থেকে মঞ্চের মহড়া—অভিনয়ের প্রতিটি পরিসরেই ছিল তাঁর উপস্থিতি। সেই ভালোবাসাই একদিন তাঁকে নিয়ে যায় রুপালি পর্দায়।
১৯৪৭ সালে ‘মায়াডোর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি। এরপর ‘দৃষ্টিদান’, ‘কামনা’, ‘মর্যাদা’, ‘সহযাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’ ও ‘কার পাপে’—একটির পর একটি ছবি ব্যর্থ হয়। ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে স্টুডিওপাড়ায় তাঁকে বিদ্রূপ করে ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলেও ডাকা হতো। অনেকে মনে করেছিলেন, তাঁর অভিনয়জীবন আর এগোবে না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।

এই কঠিন সময়েই তাঁর পাশে দাঁড়ান বর্ষীয়ান অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল। পরিচালক নির্মল দে ‘বসু পরিবার’ ছবির জন্য নতুন নায়ক খুঁজছিলেন। পাহাড়ী সান্যালই অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করেন। প্রথমে নির্মাতা দ্বিধায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর পরামর্শ মেনে নেন। পাশাপাশি অরুণ কুমারের বদলে ‘উত্তম’ নাম ব্যবহারের পরামর্শও দেন পাহাড়ী সান্যাল।
সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস। ‘বসু পরিবার’-এর সাফল্যের পর ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। জন্ম নেয় বাংলা সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি—উত্তম-সুচিত্রা। আর সেখান থেকেই নায়ক উত্তমকুমার হয়ে ওঠেন মহানায়ক।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় তিন দশকের অভিনয়জীবনে তিনি অভিনয় করেছেন ২০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে। শুধু অভিনেতা নন, পরিচালক, প্রযোজক ও সুরকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ২৯টি এবং সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে সর্বাধিক ৩২টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘গৃহদাহ’, ‘অমানুষ’ ও ‘আনন্দ আশ্রম’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও বাংলা সিনেমার অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

উত্তমকুমারের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর স্বাভাবিকতা। সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি, হাসি কিংবা নীরবতা—সবকিছুতেই ছিল সহজাত বিশ্বাসযোগ্যতা। দর্শক চরিত্রের মধ্যে অভিনেতাকে নয়, বরং বাস্তব মানুষকেই দেখতে পেতেন। তাই তিনি শুধু তাঁর সময়ের দর্শকের নন, আজকের প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
তাঁর অভিনয় নিয়ে বহু গুণীজন প্রশংসা করেছেন। সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন, উত্তমকুমারের মতো তারকা আর হবে না। সুচিত্রা সেনের ভাষায়, তিনি ছিলেন অসাধারণ শিল্পী, যদিও তাঁর প্রতিভার পুরোটা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। আর নিজের অভিনয়দর্শন সম্পর্কে উত্তমকুমার বলেছিলেন, তিনি কখনো কৃত্রিম অভিনয়ে বিশ্বাস করতেন না; মানুষের স্বাভাবিক জীবন থেকেই চরিত্র নির্মাণ করতে চাইতেন।
এ কারণেই তাঁর জাদু আজও অটুট। তিনি শুধু সফল অভিনেতা নন, বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয়ভাষাকেই নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তাঁর সিনেমা এখনও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নতুন দর্শক খুঁজে পায়, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সংলাপ ও দৃশ্য নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে প্রতি বছর যে ভালোবাসা ও আলোচনা দেখা যায়, তা প্রমাণ করে উত্তমকুমার কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নায়ক নন; তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক চিরন্তন উত্তরাধিকার।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন মহানায়ক উত্তমকুমার। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান ঘটিয়েছে, তাঁর শিল্পের নয়। কেওড়াতলায় প্রতিবছরের শ্রদ্ধাঞ্জলি, দুই বাংলার মানুষের অগাধ ভালোবাসা এবং নতুন প্রজন্মের নিরন্তর আগ্রহ আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—উত্তমকুমারের কোনো শেষ নেই। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি এবং কোটি দর্শকের হৃদয়ে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।