সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক রিলস ও ইনস্টাগ্রাম শর্টসে এখন দাপটের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে ‘পাতার বাঁশরি, পায়েতে ধরি, বেজো না বেজো না’ গানটি। গত ২৫ জুলাই কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪-এর তৃতীয় ট্র্যাক হিসেবে মুক্তির পর থেকেই গানটি ডিজিটাল দুনিয়ায় ঝড় তুলেছে।
ইউটিউবে মাত্র পাঁচ দিনেই গানটি ৮ মিলিয়ন ভিউয়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। মুকুল মজুমদার ইশান ও সুনিধি নায়েকের দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া এই ফোক-ফিউশন গানটি শুধু শ্রোতাদের মনই জয় করেনি, অল্প সময়েই পরিণত হয়েছে এক মেগা ট্রেন্ডে।
তবে অনেকেরই অজানা, এই জনপ্রিয় ট্র্যাকটি কোনো প্রাচীন প্রচলিত লোকগান নয়; বরং সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে তৈরি একটি মৌলিক সৃষ্টি।
সৃষ্টির নেপথ্যে কোক স্টুডিওর বাইরের ডেমো ট্র্যাক
অনেকের ধারণা, গানটি হয়তো কোক স্টুডিওর স্টুডিও সেটেই প্রথম তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মূল রচয়িতা ও সুরকার মুকুল মজুমদার ইশান বহু আগেই নিজের মতো করে গানটি তৈরি করে রেখেছিলেন। লিরিক্সে তাঁর সঙ্গে সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন এলিয়াস হোসেন।
গানটি নতুনভাবে আলোচনায় আসে কোক স্টুডিও বাংলার প্রযোজক শায়ান চৌধুরী অর্ণবের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে। ইশানের তৈরি করা ডেমো ট্র্যাকটি শোনার পর অর্ণব এর অসাধারণ মেলোডি ও লোকআবহ অনুধাবন করেন এবং সেটিকে সিজন ৪-এর অন্যতম প্রধান ট্র্যাক হিসেবে চূড়ান্ত করেন। পরবর্তীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় মিউজিক প্রডিউসার আদিত রহমান গানটিতে সমসাময়িক ও আধুনিক মিউজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট যোগ করে দেন বর্তমানের এই স্বতন্ত্র রূপ।

বিরহের আখ্যান ও ‘মহুয়ার পালা’র ছায়া
‘পাতার বাঁশরি’ গানের মূল উপজীব্য চিরন্তন প্রেম, তীব্র বিরহ এবং প্রিয়জনের কাছে নিঃশর্ত সমর্পণ। গানটিতে ‘বাঁশি’ বা ‘বাঁশরির সুর’কে রূপক অর্থে ভালোবাসার অমোঘ টান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
গানটির ভিজ্যুয়াল থিম এবং কস্টিউম ডিজাইনেও আবহমান বাংলার লোক-সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ গীতিকার বিখ্যাত ‘মহুয়ার পালা’র ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনীর সূক্ষ্ম অনুপ্রেরণা ও ছায়া পুরো পরিবেশনাটির পেছনে কাজ করেছে।
পানাম নগরের ৪০০ বছরের ইতিহাস ও চিত্রায়ণ
গানটির অডিও যেমন শ্রুতিমধুর, এর মিউজিক ভিডিওর সিনেমাটোগ্রাফিও তেমনি নান্দনিক। গানটির গল্প ও ইতিহাসের সঙ্গে এর চিত্রায়ণের স্থানও নিবিড়ভাবে যুক্ত। কোক স্টুডিও বাংলার অফিসিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী, পুরো শুটিং হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের ৪০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক পানাম নগরে।
ভিডিওর গল্পে দেখা যায়, বর্তমান সময়ের এক তরুণ (ইশান) পানাম নগরের নির্জন ও পরিত্যক্ত প্রাসাদের দেয়ালে কান পেতে অতীতকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ তার মনে এক প্রাচীন সুর জেগে ওঠে, আর সে গান শুরু করে। সেই সুরের জাদুতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপেক্ষারত এক রাজকন্যা (সুনিধি নায়েক) যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। ক্ষণিকের জন্য অতীত ও বর্তমান এক হয়ে যায়, কিন্তু পরমুহূর্তেই রাজকন্যা আবার মিলিয়ে যায় ধুলোবালির ইতিহাসে। গানটি মূলত দুই হৃদয়ের পুনর্মিলনের গল্প নয়; বরং অনন্তকালের বিরহ ও আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার এক রূপক আখ্যান।
রিলস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ‘ডেটা ফ্যাক্টর’
মুক্তির প্রথম ৪৮ ঘণ্টাতেই গানটি ডিজিটাল স্ট্রিমিং ও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল কনটেন্টে রূপ নেয়। ডেটা বিশ্লেষণ ও সামাজিকমাধ্যমের ট্রেন্ড অনুযায়ী এর সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, গানের সহজ ও লিরিক্যাল হুক রিলসের ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের কাটের জন্য খুবই উপযোগী হওয়ায় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এটিকে দ্রুত গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, পানাম নগরের নান্দনিক ও অ্যান্টিক থিমের কারণে ট্র্যাকটি ব্যক্তিগত ট্রাভেল ক্লিপ, সাহিত্যিক উদ্ধৃতি কিংবা সিনেমাটিক মোশন গ্রাফিক্সের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তৃতীয়ত, ইশানের ক্ল্যাসিক্যাল ফোক ঘরানা ও সুনিধি নায়েকের মিষ্টি গায়কীর মেলবন্ধন গানটির অডিও রিটেনশন রেট বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
কোক স্টুডিও বাংলার অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে মূল ভিডিওটির ভিউ প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে। একই সঙ্গে গানটি স্পটিফাই ও জিওসাভানের মতো শীর্ষস্থানীয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও ট্রেন্ডিং তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে।
সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, ‘পাতার বাঁশরি’ কেবল সাময়িক কোনো সামাজিকমাধ্যমের ট্রেন্ড নয়; বরং চলতি বছরের অন্যতম সফল ফোক-ফিউশন হিট হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।