সকল মেনু

সবশেষ
আপডেট

সরকারি হাসপাতালে যন্ত্র আছে, সেবা নেই; ওষুধেরও তীব্র সংকট

সরকারি হাসপাতাল গুলোতে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন রোগনির্ণয় (রেডিও ইমেজিং) যন্ত্র থাকলেও সেগুলোর বড় অংশই নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। একই সঙ্গে জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতিও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেলা হাসপাতালগুলোতে কাগজে-কলমে রোগনির্ণয় সেবার প্রাপ্যতা ৮৫ শতাংশ হলেও গত এক বছরে নিয়মিত সেবা চালু ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ। জেলা, উপজেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে থাকা রোগনির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশই গত এক বছরে ব্যবহার হয়নি।

বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সাত সদস্যের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।

গবেষণাটি দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে নয় মাস ধরে জরিপ, সাক্ষাৎকার ও নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যন্ত্র থাকলেও সেবা বন্ধ

গবেষণায় দেখা যায়, সব পর্যায়ের হাসপাতালে রোগনির্ণয় সেবার প্রাপ্যতা ৬৫ শতাংশ হলেও গত এক বছরে নিয়মিত সেবা মিলেছে মাত্র ২৫ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ হার ১৭ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ২৫ শতাংশ।

সেবা ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যন্ত্রপাতি অকেজো থাকা। ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্র নষ্ট থাকায় সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ১৪ শতাংশ এবং প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অভাবে ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সেবা ব্যাহত হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদই শূন্য। ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও অনেক হাসপাতালে তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই।

ওষুধের মজুতেও বড় ঘাটতি

গবেষণায় সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধেরও বড় ধরনের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত মাত্র ১২ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ হার ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের গড় প্রাপ্যতা মাত্র ২২ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ হওয়া বেশিরভাগ ওষুধ আসে সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে। তবে চাহিদা পূরণে ৩৩ শতাংশ ওষুধ অন্য উৎস থেকে কিনতে হচ্ছে।

জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামেরও অভাব

গজ, তুলা, সিরিঞ্জ ও গ্লাভসের মতো সাধারণ সরঞ্জাম থাকলেও অনেক হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে টুর্নিকেট, ৫৫ শতাংশে ব্যাগ-ভাল্‌ভ-মাস্ক (রিসাসিটেটর) এবং ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নবজাতকের নাভির ক্ল্যাম্প পাওয়া যায়নি।

ল্যাব সেবায় বৈষম্য

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালগুলোতে ল্যাব পরীক্ষার সেবা তুলনামূলক ভালো হলেও মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রাপ্যতা নেমে এসেছে ৪৩ থেকে ৪৫ শতাংশে। রিএজেন্টের ঘাটতি, যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকা এবং দক্ষ জনবলের অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাজেটের অর্থও পুরোপুরি ব্যয় হচ্ছে না

২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপে অন্তর্ভুক্ত স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট বাজেটের ৮৫ শতাংশ ব্যয় করেছে। জেলা হাসপাতালগুলোর ব্যয়ের হার সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের বাজেটের কিছু অংশ অব্যয়িত থেকে গেছে।

এছাড়া সাধারণ সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থের মাত্র ২৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। গত দুই বছরে ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেলেও তাঁদের মাত্র ৪০ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করছেন।

মন্ত্রীর মন্তব্য

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পরিকল্পনার অভাবে বহু দামি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। অনেক হাসপাতালে যন্ত্র থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট নেই।

তিনি আরও বলেন, অতীতে পরিকল্পনাহীন কেনাকাটা ও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো এবং কমিশন নেওয়ার মতো অনিয়ম বন্ধ না হলে শুধু গবেষণা বা নীতিমালা দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

সুপারিশ

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; বরাদ্দের অর্থ যেন কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় রূপ নেয়, সে সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি স্বল্পমেয়াদে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, বাজেট ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালু এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ইডিসিএলের আধুনিকায়ন, কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বিতরণব্যবস্থা আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেন।

 

সুত্র: প্রথম আলো 

ফন্ট সাইজ:
0Shares
আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলো করুন

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

×
নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন