সকল মেনু

সবশেষ
আপডেট

স্পেনে মুসলিম জনসংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়াল, বদলে যাচ্ছে জনমিতিক চিত্র

একসময় মুসলিম শাসনের কেন্দ্র ছিল স্পেনের আন্দালুস অঞ্চল। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহনকারী দেশটিতে ইসলাম এখন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, সমসাময়িক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিবাসন, নাগরিকত্ব অর্জন এবং নতুন প্রজন্মের বিকাশের ফলে স্পেনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

সাম্প্রতিক জনমিতিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা ২৫ লাখের সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে স্পেনে ইসলাম অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

২৫ লাখের নতুন মাইলফলক

স্পেনের ইসলামিক কমিশনের সহযোগিতায় প্রকাশিত অবজারভাতোরিও আন্দালুসি (Observatorio Andalusí)-এর সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৪২ হাজারের বেশি। এটিই প্রথমবার, যখন স্পেনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে।

স্পেনের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট (INE)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে দেশটির মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ। সেই হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশই মুসলিম।

যদিও স্পেনের সরকারি আদমশুমারিতে ধর্মীয় পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয় না, তবে সরকারি জনসংখ্যার তথ্য, জাতীয়তাভিত্তিক পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন গবেষণার সমন্বয়ে অবজারভাতোরিও আন্দালুসি দীর্ঘদিন ধরে এই হিসাব প্রকাশ করে আসছে। গবেষক, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এটি একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত।

ছবি : সংগৃহীত

অভিবাসী থেকে মূলধারার নাগরিক

গবেষণায় উঠে এসেছে, স্পেনের মুসলিম সমাজ এখন আর শুধু অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে স্পেনের মুসলিমদের প্রায় ৪৫ শতাংশই স্প্যানিশ নাগরিকত্বধারী। তাদের মধ্যে অনেকে জন্মসূত্রে নাগরিক, আবার অনেকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন। বাকি ৫৫ শতাংশ বিদেশি নাগরিক, যাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মরক্কোর। এছাড়া পাকিস্তান, সেনেগাল, আলজেরিয়া, মালি, গাম্বিয়া ও বাংলাদেশের নাগরিকদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।

গত দুই দশকে স্পেনে জন্ম নেওয়া মুসলিম শিশু ও তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে এমন একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যারা একই সঙ্গে স্প্যানিশ ও মুসলিম—উভয় পরিচয় বহন করছে। এই পরিবর্তন শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক কাঠামোতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

আইনি স্বীকৃতি ও ধর্মীয় অধিকার

স্পেনে মুসলিম সম্প্রদায়ের বর্তমান অবস্থান গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ১৯৯২ সালে স্পেন সরকার ও ইসলামিক কমিশন অব স্পেন (CIE)-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সহযোগিতা চুক্তি।

এই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট শর্তে সরকারি বিদ্যালয়ে ইসলামিক ধর্মীয় শিক্ষা, মুসলিম বিবাহের আইনি স্বীকৃতি এবং ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া কারাগার, হাসপাতাল ও সামরিক বাহিনীতেও ধর্মীয় সেবা প্রদানের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুবিধার বাস্তবায়ন অঞ্চলভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত

কোন অঞ্চলে মুসলিম বেশি?

জনসংখ্যার অনুপাতে স্পেনের মুর্সিয়া অঞ্চলে মুসলিমদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। সেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ মুসলিম। এরপর রয়েছে কাতালোনিয়া, যেখানে এই হার প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

অন্যদিকে মোট সংখ্যার হিসেবে কাতালোনিয়া, আন্দালুসিয়া, মাদ্রিদ ও মুর্সিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মুসলিম বসবাস করেন। শিল্প, কৃষি ও সেবাখাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি থাকায় এসব অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্য।

ইতিহাস ও পর্যটনে ইসলামের ছাপ

স্পেনের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। আলহাম্বরা প্রাসাদ, কর্ডোবার ঐতিহাসিক মসজিদ-ক্যাথেড্রালসহ অসংখ্য স্থাপনা আজও আন্দালুসীয় মুসলিম সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে।

প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো পর্যটক এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে স্পেনে যান। পাশাপাশি মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালালবান্ধব সেবা, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য অবকাঠামোও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

ছবি : সংগৃহীত

চ্যালেঞ্জও রয়েছে

জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু বাস্তব সমস্যার মুখোমুখিও হচ্ছে স্পেনের মুসলিম সম্প্রদায়। মুসলিম সংগঠনগুলোর দাবি, দেশের অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত মুসলিম কবরস্থানের অভাব রয়েছে। ফলে অনেক পরিবারকে নিজ এলাকার বাইরে মরদেহ দাফন করতে হয়, যা অতিরিক্ত ব্যয় ও মানসিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মুসলিম প্রতিনিধিরা নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সামনে কী?

জনমিতি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে স্পেনে মুসলিম জনসংখ্যা আরও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে দেশটির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নীতিনির্ধারণী বাস্তবতায়। একই সঙ্গে ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও তাদের অবদান নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্ব পাবে।.

ছবি : সংগৃহীত

স্পেনে মুসলিম জনসংখ্যার ২৫ লাখ অতিক্রম করা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ইউরোপের পরিবর্তিত জনমিতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। আজকের স্পেনে মুসলিমরা শুধু অভিবাসী সম্প্রদায় নয়, বরং শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও নাগরিক জীবনের সক্রিয় অংশীদার। আন্দালুসের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে আধুনিক বহুসাংস্কৃতিক সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামের উপস্থিতি স্পেনের সামাজিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করছে।

তথ্যসূত্র: অবজারভাতোরিও আন্দালুসি (Observatorio Andalusí), জনমিতিক গবেষণা (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪); স্পেনের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট (INE), বার্ষিক জনসংখ্যা পরিসংখ্যান ২০২৫।

ফন্ট সাইজ:
0Shares
আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলো করুন

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

×
নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফলো করুন