সকল মেনু

কেন্দুয়ার পাইকুড়া বাজারের বেহাল দশা: হারাচ্ছে ঐতিহ্য, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ—এই দুই জেলার সীমান্তবর্তী ও সংযোগস্থলে অবস্থিত নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পাইকুড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ‘পাইকুড়া বাজার’। ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাজারটির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, বর্তমানে এটি নানা সমস্যায় জর্জরিত।

দীর্ঘদিনের অবহেলা, নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সংকট এবং সঠিক তদারকির অভাবে বাজারটি এখন তার পুরনো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। ব্যাহত হচ্ছে কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য।

কাদা-পানিতে একাকার যোগাযোগ ও অবকাঠামো

সরেজমিনে বাজারটি ঘুরে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো বাজার এলাকা কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। সুপরিকল্পিত কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকে, যা ক্রেতা-বিক্রেতাদের চলাচলের অনুপযোগী করে তোলে।

বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, এখানে পর্যাপ্ত ও ব্যবহার উপযোগী কোনো গণশৌচাগার (বাথরুম) নেই। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ক্রেতা ও বিক্রেতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যুগের পর যুগ ধরে এই জনদুর্ভোগ চললেও তা নিরসনে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ভেস্তে যাচ্ছে ‘মহিলা মার্কেট’-এর উদ্দেশ্য, দখলে প্রশাসন ও কমিটি

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালে ইউএসএআইডি (USAID)-এর অর্থায়নে এবং কেয়ার বাংলাদেশ (CARE Bangladesh)-এর সহযোগিতায় এলজিইডি (LGED) কর্তৃক ২১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৩৬৫ টাকা ব্যয়ে এই বাজারে একটি গ্রামীণ বাজার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এরই অংশ হিসেবে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে বাজারে ৬ কক্ষ বিশিষ্ট একটি ‘মহিলা মার্কেট’ নির্মাণ করা হয়েছিল।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে এই কক্ষগুলো বাজার কমিটি এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাধারণ নারীরা এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না। মার্কেটটি দ্রুত নারীদের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত ও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

“নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য যে মার্কেট করা হয়েছিল, তা এখন তালাবদ্ধ বা প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে। আমরা চাই দ্রুত এটি নারীদের ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা।

সীমানা ঘেঁষে অবৈধ বাজার: হুমকিতে বৈধ ব্যবসা, রাজস্ব ক্ষতি

পাইকুড়া বাজারের বৈধ ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের কারণ এর সন্নিকটে গড়ে ওঠা আরেকটি সমান্তরাল বাজার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাইকুড়া বাজারের একদম পাশেই, পার্শ্ববর্তী জেলা ও নান্দাইল থানার অন্তর্গত সুন্দাইল এলাকায় সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে একটি নতুন বাজার গড়ে উঠেছে।

সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এই অবৈধ বাজারটি গড়ে ওঠায় ঐতিহ্যবাহী পাইকুড়া বাজারটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন বৈধ ও কর দেওয়া ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি

এটি কেবল কোনো প্রশাসনিক বা অবকাঠামোগত সংকট নয়, বরং এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধের এক মানবিক গল্প। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের প্রাণের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই বাজারটির উন্নয়নে যেন দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ী সমাজ এই চরম জনদুর্ভোগ লাঘব এবং বাজারের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী মহোদয়সহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও মানবিক হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

×