সকল মেনু

গ্যাস লিকেজে পুরো পরিবার শেষ: পাঁচজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্বজনরা

কষ্ট সইবার মতো আর অবশিষ্ট কেউ রইল না। একে একে নিভে গেল একটি পরিবারের সবকটি প্রাণ। গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান।

শনিবার সকালে মা সালমা বেগম, একমাত্র ছেলে মুন্না, দুই মেয়ে মুন্নী ও শিশু কথার সাদা কফিনে মোড়ানো লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয়েছিল গৃহকর্তা কালাম মিয়াকে। আজ তার কবরের পাশেই বাকি চারজনকে শায়িত করা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি দশতলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। গত রোববার সকাল ছয়টার দিকে তিনি রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা গ্যাস দেশলাইয়ের আগুনের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বলন্ত আগুনের মাঝেও বাবা কালাম মিয়া ঘরের দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা কামালের স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তাসহ সবাইকে নির্মমভাবে গ্রাস করে নেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। দুর্ঘটনার দিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কালাম মিয়া। স্বজনরা রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসেন গ্রামের বাড়িতে এবং সোমবার সকাল দশটায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তখনও কেউ জানত না, এই কবরের পাশে আরও চারটি কবর খুঁড়তে হবে। এরপর বুধবার বিকেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সাত বছরের অবুঝ শিশু কথা। পরে রাত এগারোটার দিকে মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না। পরদিন বৃহস্পতিবার না ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী। সর্বশেষ শুক্রবার সকাল আটটায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম।

শনিবার সকালে মা ও তিন সন্তানের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স কাড়াল বাড়ির উঠানে এসে থামে। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে যখন একে একে চারটি সাদা কফিন বের করা হচ্ছিল, তখন স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এরপর সকাল দশটায় জানাজা শেষে কামাল মিয়ার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তার স্ত্রী ও সন্তানদের। তাদের জানাজায় বাউফলের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ শত শত মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি তার পক্ষ থেকে নিহতদের লাশ পরিবহন ও দাফন সম্পন্ন করার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়।

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, প্রায় বিশ থেকে বাইশ বছর আগে কামাল বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র বিশ পঁচিশ দিন আগেও ঢাকায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই, ভাবি আর পুলাপাইন এভাবে আমাদের ছেড়ে এক্কেরে চলে যাবে।

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বলেন, ঈদের আগে ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। বাড়িতে ভাইয়েরা মিলে একটা নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ ধরছিল। ভাই বলছিল এবার কোরবানির ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু, বাকি জীবনটা স্ত্রী সন্তান নিয়া দেশের বাড়িতেই থাকমু। ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়া।

এদিকে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পেছনে ভবন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন এক স্বজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ান অলসতা করে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানায়নি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ একটি পুরো পরিবার এভাবে শেষ হয়ে যেত না। গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে একই পরিবারের পাঁচ জনের এমন নির্মম ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বাউফলের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

ফন্ট সাইজ:
1Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

×