সকল মেনু

বেতন না পেয়ে মালয়েশিয়ায় চরম সংকটে ১০৭ বাংলাদেশি

মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১০৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক টানা চার মাস ধরে বেতন না পেয়ে চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, অ্যারোফোম নামক কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য মজুরি পরিশোধ করছে না। ফলে অনেকেই খাবার কেনা, বাসাভাড়া দেওয়া এবং দৈনন্দিন অন্যান্য জরুরি খরচ মেটাতে চরম হিমশিম খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বকেয়া আদায় ও ন্যায়বিচারের আশায় তারা দেশটির শ্রম বিভাগের শরণাপন্ন হয়েছেন।

গত ২৬ জুন শুক্রবার মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং শ্রম বিভাগে এই শ্রমিকদের করা অভিযোগের প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত শুনানিতে প্রায় ৭০ জন শ্রমিক সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। শুনানির আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেই ভুক্তভোগী ১০৭ জন শ্রমিক সম্মিলিতভাবে দেশটির বিশিষ্ট আইনজীবী লতিফা কোয়াকে তাদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন।

শুনানির শুরুতে শ্রম বিভাগের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি মধ্যস্থতার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে নিয়োগকর্তা পক্ষ সাফ জানিয়ে দেয় যে, বিষয়টি তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব তাদের নেই। একই সাথে তারা বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতে নতুন করে আরেকটি মধ্যস্থতার তারিখ নির্ধারণের আবেদন জানায়। অন্যদিকে শ্রমিকদের আইনজীবী লতিফা কোয়া এই আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং কোনো প্রকার বিলম্ব না করে সরাসরি শুনানির মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি তোলেন।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করে। এই দীর্ঘ সময় পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে উপস্থিত শ্রমিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে, ইতিমধ্যে টানা চার মাস ধরে বেতন ছাড়া অমানবিক জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এর ওপর বকেয়া টাকা পাওয়ার জন্য আরও প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করা তাদের বর্তমান দুর্ভোগকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

বেতন না পাওয়ায় শ্রমিকদের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন আয়ের পথ বন্ধ থাকায় অনেকেই ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। অনেকের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কেনার মতো ন্যূনতম অর্থ নেই, আবার কেউ কেউ সময়মতো বাসাভাড়া পরিশোধ করতে না পেরে বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। শ্রম দিয়েও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় তারা এখন পুরোপুরি নিরুপায়।

শুনানি চলাকালে আইনজীবী লতিফা কোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষার প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি দাবি জানান, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো শ্রমিককে যেন মালয়েশিয়া থেকে বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশন করা না হয়। কারণ আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন অভিবাসন-সংক্রান্ত কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ বা জটিল হয়ে যেতে পারে।

শ্রম বিভাগের শুনানি শেষে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও তাদের সমর্থকরা জেটিকে কার্যালয়ের বাইরে সমবেত হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সংহতি কর্মসূচি পালন করেন। হাতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ, অভিবাসী শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার জোর দাবি জানান। পুরো কর্মসূচিটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।

পরবর্তীতে শ্রমিকদের নিজস্ব আবাসস্থলে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে তাদের বর্তমান অমানবিক সংকট থেকে উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় শ্রমিকরা তাদের বকেয়া মজুরি দ্রুত আদায়, দৈনন্দিন বেঁচে থাকার জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা এবং মামলা চলাকালে মালিকপক্ষের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বা অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতা থেকে সুরক্ষার দাবি পুনরায় তুলে ধরেন।

শ্রমিকদের এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আয়োজকরা। তারা উল্লেখ করেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো শ্রমিকদের আইনি ও মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাদের কাছে জরুরি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, মামলার সপক্ষে প্রয়োজনীয় সব প্রমাণ ও দালিলিক নথিপত্র সংরক্ষণ করা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এই লড়াইকে আরও বেগবান করা।

সংশ্লিষ্ট ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, চার মাস ধরে আয়ের একমাত্র উৎস বন্ধ থাকার পরও যদি শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘসূত্রতা চলতে থাকে, তবে এটি কেবল শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বড় প্রশ্ন হিসেবে সামনে চলে আসবে।

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

×