পিলখানা হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জড়িত থাকার এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ থাকার পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। গতকাল রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করেন কমিশনের সদস্যরা। প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর গতকাল সন্ধ্যায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হয় এবং হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট, পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্টতা ও দায়-দায়িত্ব নিয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা দেন কমিশনের সদস্যরা।
তদন্তের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরে কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল। দেশকে অস্থিতিশীল করা, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা এবং সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল করাই ছিল এই বিদ্রোহের উদ্দেশ্য।
কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল জানান, তদন্তে উঠে এসেছে যে বিদ্রোহের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের নাম তদন্তে এসেছে। তারা হলেন—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মীর্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারেক। এছাড়া সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আবিদ-এর নামও তিনি উল্লেখ করেন।
বিডিআর বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিশন প্রধান বলেন, এর অনেকগুলো কারণ ছিল। অপারেশন ডাল-ভাত কর্মসূচি এবং বিডিআর শপ তৈরি করায় ডিউটি বেড়ে গিয়েছিল। বিডিআরের সদস্যরা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বাহিনীতে চাচ্ছিল না এবং বিডিআরের ভেতরে নানা ধরনের সংকট ছিল, যা তদন্তে পাওয়া গেছে। তবে কমিশনের তদন্তে বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা, প্রতিবেশী একটি দেশ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা।
তিনি সরাসরি বলেন, প্রতিবেশী দেশটি ছিল এই বিদ্রোহের বেনিফিশিয়ারি। কমিশন আরও জানিয়েছে, ওই সময় প্রতিবেশী একটি দেশের ৯২১ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, যাদের অনেকের হিসাব মেলেনি। সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চাইতে সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিশন।
বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে পাঁচ সেনা কর্মকর্তাকে গুম করার বিষয়ে কমিশন প্রমাণ পেয়েছে বলে জানানো হয়। পিলখানার ৫ নম্বর গেটে র্যাবের সদস্যরা মোতায়েন ছিল। সেই সময়ে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন কর্নেল রেজা নুর। হত্যাকাণ্ড চললেও কর্নেল রেজা নুরের নিষেধ থাকায় র্যাব কোনো ভূমিকা নেয়নি। কমিশন এ বিষয়টি নিয়েও সুপারিশ করেছে।
কমিশন প্রধান বলেন, অপারেশন ডাল-ভাত নিয়ে ক্ষোভকে সামনে আনা হলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা ও বিডিআরকে দুর্বল করা। এটাকে আড়াল করতেই অপারেশন ডাল-ভাত ও আর্মি অফিসারদের বিষয়ে ক্ষোভকে সামনে আনা হয়েছিল।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, সেনাবাহিনীতে যারা তিনবার বোর্ডে সুপারসিডেট হওয়ায় পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন এবং যাদের চাকরি চলে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকেই এই বিদ্রোহে সরকারকে সহযোগিতা করেছে। কমিশন প্রধান উদাহরণ দিয়ে বলেন, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে সুপারসিডেট ছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহের পরে তাকে পদোন্নতি দিয়ে বিজিবি প্রধান ও পরে সেনাপ্রধান করা হয়। কমিশন মনে করে, দুর্বল জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে সরকার নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এই কাজ করেছিল।
বিদ্রোহ দমনে সেনা অভিযান না হওয়াকে একটি মূল ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে কমিশন প্রধান বলেন, সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন বিদ্রোহের সময় সেনা সদর ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যান এবং দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করেন। এতে কমান্ড নিয়ন্ত্রণ শূন্যতা তৈরি হয়। সেই সময়ে আক্রমণ করলে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা পরাজিত হতো, কিন্তু সেটা করা হয়নি। ৪৬ ব্রিগেডকে প্রথমে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে সেনা মোতায়েন পেছনে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দুই দিনে যখন একটি দেশে ৫৭ জন কর্মকর্তা নিহত হয়, সে দেশের স্বাধীনতা থাকে না।
তদন্ত কমিটির সভাপতি বলেন, গোয়েন্দা ব্যর্থতা পর্বত প্রমাণ ছিল। গোয়েন্দা কার্যক্রম শক্তিশালী করাসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ঘটনার সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হলে আগামীতে আবারও বিদ্রোহ ঘটতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই কাজের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এই প্রতিবেদন জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।