প্রায় ১৪ লাখ বছর আগের জীবাশ্মে পরিণত হওয়া পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, প্লাইস্টোসিন যুগের প্রাচীন মানবসমাজে নারী ও পুরুষের দায়িত্ব আলাদা ছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
বর্তমান কেনিয়ার লেক টারকানার আশপাশের কাদামাটিতে সংরক্ষিত ২১টি জীবাশ্ম পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ধারণা করেছেন, এগুলো আটজন হোমিনিনের। গবেষণায় দেখা যায়, তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং মানুষের বিলুপ্ত প্রজাতি প্যারানথ্রোপাস বোইসেই-এর সদস্য।
গবেষকদের মতে, একই এলাকায় বসবাসকারী হোমো ইরেক্টাস-এর সঙ্গে তাদের উচ্চতা প্রায় সমান ছিল। আগে ধারণা করা হতো, প্যারানথ্রোপাস বোইসেই তুলনামূলকভাবে খাটো ও ভারী গড়নের ছিল। তবে আধুনিক দ্বিমাত্রিক (২ডি) ও ত্রিমাত্রিক (৩ডি) প্রযুক্তিতে পদচিহ্ন বিশ্লেষণের পর দেখা গেছে, তাদের দেহের আকার পূর্বের ধারণার চেয়ে অনেক বড় ছিল।
নারী বা শিশুদের কোনো পদচিহ্ন না পাওয়ায় গবেষকদের ধারণা, পুরুষদের এই দলটি নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা অভিযানে বের হয়েছিল। বর্তমানের বৃহৎ বনমানুষদের সমাজেও পুরুষরা দলবদ্ধভাবে এলাকা পাহারা দেওয়া, সীমানা রক্ষা এবং শিকারে অংশ নেয়। সেই তুলনা থেকেই গবেষকরা মনে করছেন, প্রাচীন মানবসমাজেও দায়িত্বের একটি বিভাজন থাকতে পারে।
গবেষণার সহলেখক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. নিল রোচ বলেন, আটজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের একসঙ্গে চলাচল এই প্রজাতির জটিল সামাজিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, তারা সম্ভবত বড় দলে বাস করত। সঙ্গী পাওয়ার প্রতিযোগিতা থাকলেও বিপজ্জনক পরিবেশে নিরাপত্তার স্বার্থে একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করত।

প্যারানথ্রোপাস বোইসেই ছিল অস্ট্রালোপিথেসিন গোষ্ঠীর একটি প্রজাতি, যা প্রায় ২৫ লাখ থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় বাস করত। তারা আধুনিক মানুষের সরাসরি পূর্বপুরুষ না হলেও একই পূর্বসূরি থেকে উদ্ভূত একটি পৃথক বিবর্তনীয় শাখা ছিল এবং পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এর আগে এই প্রজাতি সম্পর্কে অধিকাংশ তথ্য পাওয়া গিয়েছিল বড় চোয়াল ও দাঁতযুক্ত খুলির জীবাশ্ম থেকে। শরীরের নিচের অংশ সম্পর্কে তথ্য ছিল খুবই সীমিত। নতুন গবেষণায় পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, তাদের উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট পর্যন্ত এবং ওজন প্রায় ৭৫ কেজি হতে পারে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোল্যুশনারি অ্যানথ্রোপোলজির গবেষক ড. কেভিন হাতালা বলেন, জীবাশ্ম পদচিহ্নই বিলুপ্ত কোনো প্রজাতির সামাজিক আচরণ সম্পর্কে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয়। তার মতে, এই আবিষ্কার থেকে ধারণা করা যায়, প্যারানথ্রোপাস বোইসেই বহু পুরুষ সদস্যবিশিষ্ট দলে বাস করত এবং তাদের সামাজিক কৌশলে পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
গবেষকরা আশপাশের শিলাস্তরের আগ্নেয় ছাই বিশ্লেষণ করে পদচিহ্নগুলোর বয়স প্রায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার বছর নির্ধারণ করেছেন। একই এলাকায় জলহস্তী, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর পদচিহ্নও পাওয়া গেছে।
প্রায় ৫০ বছর আগে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরির গবেষক ড. কে বেহরেন্সমেয়ার প্রথম এসব পদচিহ্ন শনাক্ত করেন। ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য সেগুলো বালুর নিচে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সম্প্রতি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পুনরায় বিশ্লেষণ করে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।
ড. বেহরেন্সমেয়ার বলেন, জীবাশ্ম পদচিহ্ন একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে সংরক্ষণ করে রাখে। বিচ্ছিন্ন হাড় বা চোয়ালের তুলনায় পদচিহ্ন মানুষের কাছে অতীতের জীবনের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
গত কয়েক দশকে পূর্ব টারকানা হ্রদাঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ের শত শত হোমিনিনের পদচিহ্ন উদ্ধার হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্যারানথ্রোপাস বোইসেই ও হোমো ইরেক্টাসের দেহের আকার প্রায় সমান ছিল—এই নতুন তথ্য প্রজাতিটি কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল, সে বিষয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও দুই প্রজাতির মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ
আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।
https://www.nabonews24.com/science-technology/2026/07/30/newsid-6493/© NABO NEWS24 | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ০২-০৮-২০২৬, ০৪:৫৬ অপরাহ্ণ