NABO NEWS24
প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণে ৪ জন সাক্ষী লাগে না, এটি ভুল ধারণা: ডা. জাকির নায়েক

লেখক: ডিজিটাল ডেস্ক:

বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা একটি দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় ইসলামী শরিয়া আইনের উদাহরণ টেনে অনেকে দাবি করেন, ধর্ষণের শিকার হওয়া একজন নারীর কাছে অপরাধ প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া যায় না। এই বিধানটি আসলে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামি স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট টেলিভিশন ‘হুদা টিভি’-র এক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা ডা. জাকির নায়েক বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন, অনেক মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ইসলামি আইনে ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মানুষ মূলত ব্যভিচার বা জিনার (সম্মতিপূর্ণ অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক) অভিযোগ প্রমাণের শর্তের সাথে ধর্ষণের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেছে।

ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নির্দোষ নারীর বিরুদ্ধে জিনা বা ব্যভিচারের অভিযোগ আনে, তবে তা প্রমাণ করতে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হবে। যদি সে সাক্ষী আনতে না পারে, তবে উল্টো মিথ্যা অপবাদের জন্য অভিযোগকারীকে ৮০টি দোররা বা বেত্রাঘাত করা হবে। সুতরাং, এই চারজন সাক্ষীর শর্তটি কেবল ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ থেকে নির্দোষ মানুষকে বাঁচাতে দেওয়া হয়েছে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিষয়টি মোটেও এমন নয়; কারণ ধর্ষণ এবং জিনা পুরোপুরি আলাদা বিষয়। জিনা বা ব্যভিচার সংঘটিত হয় উভয় পক্ষের পারস্পরিক শান্ত ও সম্মতিপূর্ণ বোঝাপড়ায়, পক্ষান্তরে ধর্ষণের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কটি একজনের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়।

এ ধরনের জোরপূর্বক অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদগণ পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত ‘হিরাবাহ’ বা জমিনে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টির শাস্তির উদ্ধৃতি দেন। ইসলামি আইনবিদদের মতে, ধর্ষণ মূলত এক ধরনের সন্ত্রাস বা নৈরাজ্য। কারণ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও একজন নারীকে অস্ত্রের মুখে বা ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে জোরপূর্বক নির্যাতন করা হয়।

ধর্ষণের অপরাধ যদি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, তবে অপরাধীর শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড (Capital Punishment)। হিরাবাহ বা এই ধরনের সন্ত্রাস প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষীর কোনো প্রয়োজন নেই, দুইজন সাক্ষীই যথেষ্ট। এমনকি এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতিগত বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণও (Circumstantial Evidence) আদালতে সমানভাবে আমলে নেওয়া হয়। সমস্ত প্রমাণাদি বিবেচনা করে বিচারক যদি শতভাগ নিশ্চিত হন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিটিই ধর্ষক, তবে সে মৃত্যুদণ্ড পাবে। আর যদি শতভাগ নিশ্চিত হতে না পারেন, তবে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কারাদণ্ড বা দোররা মারার মতো অন্যান্য শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।

তবে অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় সমাজকে বার্তা দিতে বিচারক চাইলে কোরআনে বর্ণিত অন্যান্য কঠোর শাস্তি, যেমন—অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে লাশ জনসম্মুখে ঝুলিয়ে রাখা কিংবা হাত-পা কেটে ফেলার মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দিতে পারেন। তবে অপরাধ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হলে মূল শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই, এবং এই ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণই যথেষ্ট, চারজন সাক্ষীর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম শাফেঈর (রহ.) অভিমত হলো, ধর্ষককে নির্ধারিত শারীরিক শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীকে তার মর্যাদা অনুযায়ী উপযুক্ত মোহর বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং সুফিয়ান সাওরীর (রহ.) মতে, অপরাধীর জন্য নির্ধারিত আইনি শাস্তিই যথেষ্ট, আলাদা কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন নেই। মতামত ভিন্ন হলেও ধর্ষণের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষী যে কোনো শর্ত নয়—এ ব্যাপারে সব ইসলামি স্কলার একমত।

স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুগে মদিনায় ঘটা একটি ধর্ষণের ঘটনা সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে। এক নারী অন্ধকার রাতে মসজিদের দিকে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে ধর্ষণ করে। নারীটির চিৎকার শুনে মানুষ ছুটে আসার আগেই ধর্ষক পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী নারীর বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে লোকেরা এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দরবারে নিয়ে আসে। ভুক্তভোগী নারীও ভুলবশত তাকেই ধর্ষক হিসেবে শনাক্ত করেন। কিন্তু যখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে যাবেন, তখন প্রকৃত অপরাধী নিজে থেকে সামনে এগিয়ে এসে নিজের দোষ স্বীকার করে।

তখন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দোষ লোকটিকে ছেড়ে দেন এবং ভুক্তভোগী নারীকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন, কারণ ভুলবশত প্রথম ব্যক্তিকে ধর্ষক মনে করার পেছনে ওই নারীর কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। আর যিনি প্রকৃত ধর্ষক ছিলেন এবং নিজে এসে অপরাধ স্বীকার করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিন্তু ভুক্তভোগী নারীর কাছে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী দাবি করেননি। এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতিগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট ছিল।

সুতরাং, রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমল থেকেই এটি স্পষ্ট যে, ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী আনা বাধ্যতামূলক নয়। ধর্ষণের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক বা ফরেনসিক প্রমাণাদিই অপরাধীকে শনাক্ত করতে যথেষ্ট, এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে এর চূড়ান্ত শাস্তি কেবলই মৃত্যুদণ্ড।

প্রধান সম্পাদক: মোঃ রেজাউল্লাহ রেজা

প্রকাশক: মোঃ নাজমুল হুসাইন

নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ তরিকুল ইসলাম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বিটিএ টাওয়ার (১২ তলা), ২৯ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, রোড#১৭, বনানী সি/এ, ঢাকা-১২১৩।

ফোন : ০২-২২৬৬০৩৩৭, ০১৭১১-৬৫৪৭৬৬
ই-মেইল : info@nabonews24.com, nabonews24@yahoo.com (News)

(A Sister Concern of Fujisan Properties Ltd.)

QR Code

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।

https://www.nabonews24.com/%e0%a6%a7%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae/2026/06/05/newsid-4578/

© NABO NEWS24 | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ০১-০৭-২০২৬, ০২:৩২ পূর্বাহ্ণ